সদ্য সমাপ্ত দাওরা পরীক্ষা; সিলেটের তরুণ আলেমদের মূল্যায়ন
ইলিয়াস মশহুদ :: কওমি
মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান
দেওয়ার পর প্রথম পরীক্ষা গত ১৫ মে থেকে। শেষ হয়েছে আজ ২৫ শে মে,
বৃহস্পতিবার।
গত ১১ এপ্রিল গণভবনে আলেম-উলামাদের এক
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী দেওবন্দের মূলনীতি বজায় রেখে কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে
হাদীসকে সরকারিভাবে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ে এম.এ
সমমান) সমমান ঘোষণা দেন। তবে স্বীকৃতির ঘোষণা পরবর্তী পক্ষে-বিপক্ষে
দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই অভিন্ন প্রশ্নপত্রে
একসঙ্গে সব বোর্ডের অধীন মাদ্রাসাগুলোতে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নেওয়া
হয়েছে। আর এজন্য গঠন করা হয়েছে ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া
বাংলাদেশ’ নামে নতুন সংস্থা। এই সংস্থার অধীনে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা
গ্রহণ ও সনদ বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
গত ১৬ এপ্রিল রবিবার চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় দেশের সব কওমি মাদ্রাসা বোর্ড কর্তৃক গঠিত মান বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত ১৬ এপ্রিল রবিবার চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় দেশের সব কওমি মাদ্রাসা বোর্ড কর্তৃক গঠিত মান বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বীকৃতি ঘোষণা পরবর্তী অনুষ্ঠিত
মাস্টার্স সমমান দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা কেমন হয়েছে, এ সম্পর্কে অনুভূতি
জানতে কওমিকণ্ঠ ডটকমের পক্ষ থেকে কথা হয় সিলেটের শীর্ষ কয়েকজন তরুণ আলেমের
সাথে। মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সাথে তাঁরা তাদের অভিমত জানিয়েছেন।
আলোচনার চুম্বকাংশ কওমিকণ্ঠ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হল-
সার্বিক বিচারে এটা অবশ্যই খুশির বিষয়।
দেশের পরবলিক পরীক্ষাসহ জেনারেল শিক্ষাধারার অন্যান্ন শিক্ষাব্যবস্থায়
প্রায় সব ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষায় অসাধুপন্থা অবলম্বন হয়, যা দেশবাসী
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারেন। এদিক দিয়ে
কওমি মাদরাসা অবশ্যই স্বাত্রন্ত্র বৈশিষ্ঠ লালন করে। নিরিবিলি পরিবেশে
অত্যতন্ত সু-শৃঙ্খলভাবে ছাত্ররা পরীক্ষা দেয়।
আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার
তত্ত্ববধানে চলমান দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নিয়ে তাঁর কণ্ঠে ঝরলো উচ্ছাস আর
প্রশংসার ফলজুরি। তিনি বলেন, এবারের দাওরার পরীক্ষা, ঐতিহাসিক একটা
পরীক্ষা।
‘আলহামদুলিল্লাহ! কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট
অনুযায়ি সম্পূর্ণ নকলমুক্ত নজিরবিহীন পরীক্ষা চলছে।কওমি মাদরাসার ইতিহাসে
কোনো ছাত্র নকলবাজি কিংবা কোনো ধরনের হেল্প নিয়ে পরীক্ষা দেয়ার নজির নাই
এবং থাকবেও না’। তিনি পরীক্ষার সাার্বিক অবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাষশ করেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় তারা তাদের
সর্বোচ্চ ডিগ্রীর একটি সম্মানজনক মান পাবে। তিনি আরো বলেন, এদেশের লাখো
তরুণ চায় স্বীকৃতির বাস্তবায়ন ২০১৭ সালের ভিতরে যেনো হয়। তা না হলে উলামায়ে
কেরাম এবং তরুণ প্রজন্ম ভুল বুঝতে পারে। এখন যদি এটাকে কোন কারণে ঠেকিয়ে
রাখা হয়, তাহলে সেটা হবে দুঃখজনক এবং সরকারের জন্য চরম বিপজ্জনক।
এবারের দাওরা পরীক্ষায় সিলেটের বৃহত্তর
জৈন্তার কেউ যদি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হতে, পারেন, তবে গ্রেটার জৈন্তার
পক্ষথেকে ৫০, ৪০, ৩০ হাজার টাকার তিনটি পুরস্কার ঘোষণা সম্পর্কে মাওলানা
রশীদ আহমদ বলেন, যদি সনদের বাস্তবায়ন হয় তাহলে প্রয়োজনে আগামীতে সিলেট
সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হবে- ইনশাআল্লাহ্।
স্বীকৃতির ঘোষণা প্রাপ্তির পর থেকেই
ছাত্রদের মাঝে অন্যরকম এক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য
করেন। তিনি বলেন, শুধু ছাত্ররা নয় সবাার মাঝেই একটা উৎসবমুখর অবস্থা বিরাজ
করছে।
মুফতী জিয়াউর রহমান আরো বলেন,
শিক্ষার্থীরা আনন্দিত হলেও শিক্ষকদের সার্বিক অবস্থাটা খুব হতাশাজনকজনক
ব্যাপার। বছর শেষেও অনেক মাদরাসার শিক্ষক তার ন্যায্য সম্মানীটাও সাথে করে
নিয়ে যেতে পারেন না। বেতনই বা আর কতো, কোনো রকমে পকেট খরচ চালানো মত
বেতন, তার ওপর মাসের পর মাস বাকি, একজন মানুষ সে নিজে কীভাবে চলবে আর
সংসারে কী দেবে- এবিষয়টা খুবই পীড়া দেয় আমাকে। মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে হলেও
এদিকে একটু খেয়াল করা চাই।
যাক, সরকার মহোদয় স্বীকৃতির ঘোষণা
দিয়েছেন। সময়ই বলে দিবে এটা মোরগের ডিম, না ঘোড়ার ডিম। এই স্বীকৃতিকে
কেন্দ্র করেই দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা একসাথে হচ্ছে। এর ইতিবাচক দিক হলো,
এর ফলে পড়ালেখার মান আরো বাড়বে এবং একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। শুরুও হয়ে
গিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি মনে করি, স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হোক বা না হোক,
অন্তত দাওরার পরীক্ষা একসাথে হওয়ার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক।
দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা একসাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে।
দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা একসাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে।
জামিয়া মমাহমুদিয়া সুবহানীঘাট মাদরাসার উস্তায হাফিয মাওলানা আহমদ সগীর আমকুনী
আল হাইয়ার নিয়ন্ত্রণে দেশে প্রথমবারের মত অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদিসের
পরীক্ষার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, পরীক্ষার
সার্বিক অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার আপডেট সংবাদ
যেভাবে মিডিয়ায় আসে, দুঃখজনক হলেও সত্য, কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর
দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শতভাগ নকলমুক্ত পরিবেশে
অনুষ্ঠিত হলেও মিডিয়ার চোখে সেসব আকর্ষণ করেনা। মিডিয়াকেন্দ্রিক দুর্বলতার
এসব কুফল ভোগ করছি আমরা। তাই অন্যসব বিষয়ের সাথে সাথে মিডিয়ার দিকে আমাদের
নজর দিতে হবে। সময়ের প্রয়োজনে।
একসাথে সারা দেশের সব দওরা শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে, যে কারণেই হোক, এর ইতিবাচক দিক হলো, এর ফলে পড়ালেখার মান আরো বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হবে।
আমি মনে করি, এই স্বীকৃতি ঘোষণার মাধ্যমে উলামাদের মাঝে একটা ইত্তেফাকী মনোভাব তৈরি হয়েছে। এটা অনেক পাওয়া।
আর যদি স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হয়ে যায়, আমাদের যে মান দেয়া হয়েছে, এর দ্বারা দেশের সব ধর্মীয় বিভাগে কওমিদের অংশগ্রহণ বাড়বে। একসময় সরকারী সনদের অভাবে যা আমাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছিল না।
আর যদি স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হয়ে যায়, আমাদের যে মান দেয়া হয়েছে, এর দ্বারা দেশের সব ধর্মীয় বিভাগে কওমিদের অংশগ্রহণ বাড়বে। একসময় সরকারী সনদের অভাবে যা আমাদের দ্বারা সম্ভব হচ্ছিল না।
অাগে শুধুমাত্র একটি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা ছিলো, কাজেই ছাত্র-ছাত্রীদের মাজে প্রতিযোগিতাও ছিলো সীমিত৷ এবার সারা দেশের ৭৩৭ টি মাদরাসা এক ছাতার নিচে পরীক্ষা দিচ্ছে, এতে ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার মান ঝাচাই ও প্রতিযোগিতার পরিসর ব্যাপক হচ্ছে ৷ অনেক মাদরাসা এতেকরে অারো বেশী মনোযোগী হবে ৷
সম্মিলিত পরীক্ষার ব্যবস্থা খুব কম সময়
হাতে নিয়ে করা হয়েছে, এজন্য সামান্য কিছু ত্রুটি থাকাটা স্বাভাবিক৷ এবারের
পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অনেক অনাকাংখিত অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে, আশাকরি
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সচেতনতায় ভবিষ্যতে এগুলো দূর হবে৷



0 মন্তব্য করেছেন:
Post a Comment